বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীদের ভুয়া চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে সাইবার প্রতারণার কাজে বাধ্য করার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শত শত বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, একটি সুসংগঠিত মানব পাচার চক্র ভুয়া চাকরির অফার দিয়ে যুবকদের বিদেশে পাঠাচ্ছে এবং পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও নথি কেড়ে নিয়ে সাইবার প্রতারণার কাজে নিযুক্ত করছে।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলে স্টারের বিশেষ প্রতিবেদনে ফেরত আসা শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাদের কম্পিউটার অপারেটর, ডাটা এন্ট্রি বা ফ্যাক্টরি কর্মীর চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের ভিসা দেখা যায় পর্যটক বা নির্মাণ শ্রমিকের নামে দেওয়া হয়েছে। এরপর স্থানীয় দালালরা তাদের পাহাড়ি এলাকা বা সিহানুকভিলের কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা কম্পাউন্ডে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের জানানো হয়, তারা আসলে প্রতারণার কাজে বিক্রি হয়ে গেছেন।
সিরাজগঞ্জের তোফায়েল আহমেদ সাত লাখ টাকা দিয়ে কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির আশায় কম্বোডিয়া যান। পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও টাকা কেড়ে নিয়ে তাকে অনলাইনে নারী সেজে প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়। কাজ না করলে তাকে হকিস্টিক দিয়ে মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। প্রায় দুই মাস পর পরিবারের কাছ থেকে টাকা এনে তিনি মুক্তি পান।
মানিকগঞ্জের তালাত মাহমুদও একইভাবে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে চাকরির আশায় কম্বোডিয়া গিয়ে প্রতারণার ফাঁদে পড়েন। তাকে জানানো হয়, তিনি তিন হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছেন। কাজ করতে অস্বীকার করলে তাকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় এবং খাবার ও পানি থেকে বঞ্চিত করা হয়।
ফরিদপুরের আল আমিন জানান, তাকে দেড় হাজার ডলারে বিক্রি করা হয়েছিল। তার কাজ ছিল মার্কিন অবসরপ্রাপ্তদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করা এবং পরে অন্যরা সম্পর্ক গড়ে ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করত। তিনি বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল আমরা এক বছরের জন্য কেনা হয়েছি, টাকা না ফেরত দিলে মুক্তি নেই।”
নারীরাও এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। মাইমুনা আক্তার মিলা জানান, তাকে মাসিক ৮০ হাজার টাকার চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ৫৮৩ জন বাংলাদেশিকে ক্যাম্বোডিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গত দেড় বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন। তাদের অনেকেই একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা একে “সাইবার দাসত্ব” বলে অভিহিত করেছেন। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “এটি শুধু মানব পাচার নয়, বরং সাইবার প্রতারণা। ভুক্তভোগীদের দিয়ে অন্যদের প্রতারণা করানো হচ্ছে।”
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যেই কয়েকজন দালালকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে ফেরত আসা অনেকেই মামলা করতে অনিচ্ছুক। কেউ কেউ দালালের সঙ্গে সমঝোতায় টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামে কর্মসংস্থানের ভিসা যাচাই আরো কঠোর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভিসা জালিয়াতি ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
logo-1-1740906910.png)