ভারতের খাদ্য ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। নানা সাম্রাজ্য, যুদ্ধ, বাণিজ্য পথ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু খাবার আজও টিকে আছে। প্রাচীন গ্রন্থ, মন্দিরের রীতি ও আঞ্চলিক রান্নার ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা এসব খাবার শুধু সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি, বরং আজও প্রতিদিনের খাবারের অংশ হয়ে আছে। এখানে তুলে ধরা হলো ছয়টি খাবার, যেগুলো এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয়দের প্রিয়।
ইডলি
ভারতের অন্যতম প্রাচীন প্রাতঃরাশ ইডলি। ৮ম থেকে ১০ম শতাব্দীতেই এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। প্রাচীন কন্নড় গ্রন্থ ভদ্দারাধনে (৯২০ খ্রিস্টাব্দ) তে ‘ইড্ডালিগে’ নামে এক ধরনের ভাপানো খাবারের উল্লেখ আছে। আজকের নরম, ফারমেন্টেড চাল ও উড়দ ডালের ব্যাটার থেকে তৈরি ইডলি সেই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা। ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া খাবারকে হালকা, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর করে তোলে। সাম্বর ও নারকেল চাটনির সঙ্গে ইডলি আজও ভারতের ঘরে ঘরে জনপ্রিয়।
পঙ্গল
তামিল সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত পঙ্গল শুধু খাবার নয়, বরং উৎসবের প্রতীক। সাঙ্গম সাহিত্যে দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো সময়ে ধান সিদ্ধ করে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার উল্লেখ পাওয়া যায়। ফসল তোলার পর সূর্যদেবকে ধন্যবাদ জানাতে মাটির হাঁড়িতে সিদ্ধ করা হয় নতুন ধান। কালো মরিচ, জিরা, আদা ও ঘি দিয়ে তৈরি নোনতা পঙ্গল আজও দক্ষিণ ভারতের ঘরে ও মন্দিরে পরিবেশিত হয়।
পায়াসম
দুধ, চাল, গুড় ও ঘি দিয়ে তৈরি পায়াসমের ইতিহাসও হাজার বছরের পুরনো। সংস্কৃত গ্রন্থ ও মন্দিরের রেকর্ডে এ মিষ্টান্নের উল্লেখ পাওয়া যায়। মন্দিরে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন হিসেবে শুরু হলেও পরে উৎসব ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে রান্না করা এ মিষ্টি আজও ভারতের অন্যতম প্রিয় ডেজার্ট।
পুট্টু
কেরালার ঐতিহ্যবাহী খাবার পুট্টু, যা চালের গুঁড়া ও নারকেল স্তরে স্তরে সাজিয়ে ভাপে রান্না করা হয়। মধ্যযুগীয় মালয়ালম সাহিত্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। আগে বাঁশের নল ব্যবহার করে রান্না করা হতো, পরে ধাতব ছাঁচে প্রচলিত হয়। কদলা কারি, কলা বা গুড়ের সঙ্গে পরিবেশিত পুট্টু আজও কেরালার সকালের খাবারের অংশ।
আপ্পম
ফারমেন্টেড চালের ব্যাটার থেকে তৈরি আপ্পমের ইতিহাসও এক হাজার বছরের বেশি পুরনো। কেরালা ও তামিলনাড়ুতে এর প্রচলন ছিল। লেসের মতো প্রান্ত ও নরম মাঝখান তৈরি হয় প্রাকৃতিক ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে। সবজি স্ট্যু বা নারকেল দুধের সঙ্গে পরিবেশিত আপ্পম আজও দক্ষিণ ভারতের রান্নাঘরে অপরিহার্য।
খিচুড়ি
ভারতের আরামদায়ক খাবার খিচুড়ির ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ চরক সংহিতাতে চাল ও ডালের মিশ্রণকে সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৪শ শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ভারতে খিচুড়ির জনপ্রিয়তার কথা লিখেছেন। আজও চাল ও ডালের সহজ সংমিশ্রণ ভারতের প্রতিটি অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে রান্না হয়।
ভারতের এই ছয়টি খাবার প্রমাণ করে, প্রাচীন রন্ধনশৈলী শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, বরং আজও জীবন্ত। সময়ের সঙ্গে উপকরণ ও পরিবেশনের ধরন বদলালেও মূল স্বাদ ও ঐতিহ্য অটুট রয়েছে। ইডলি, পঙ্গল, পায়াসম, পুট্টু, আপ্পম ও খিচুড়ি আজও ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবনে প্রাচীনতার স্বাদ এনে দেয়।
logo-1-1740906910.png)