ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম পাপুয়ার আসমাত অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন স্থান হিসেবে ধরা হয়। সেখানে পৌঁছাতে পর্যটকদের একাধিক বিমানযাত্রা, আরাফুরা সাগর পাড়ি দিয়ে দুই দিনের নৌভ্রমণ এবং তারপর বৃষ্টি-অরণ্যের নদীপথে নৌকায় যাত্রা করতে হয়। এই দীর্ঘ পথই আসমাতকে রহস্যময় ও অনন্য করে তুলেছে।
ভ্রমণ লেখিকা লরা ফ্রেঞ্চ তাঁর সপ্তাহব্যাপী সমুদ্রযাত্রায় আসমাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। কাইমানা বন্দর থেকে ৩২০ নটিক্যাল মাইলের যাত্রায় তার জাহাজের সঙ্গে আর কোনো নৌযানের দেখা মেলেনি। স্থানীয় গাইড ভিক্টরের মতে, আসমাতের কিছু গ্রামে গত ১০ বছরে কোনো পর্যটক আসেননি।
আসমাতের গ্রামগুলোতে পৌঁছালে স্থানীয়রা ঐতিহ্যবাহী গান গেয়ে নৌকা বেয়ে অতিথিদের স্বাগত জানায়। তালপাতা, পাখির পালক ও ঝিনুকের গুঁড়ো দিয়ে সাজানো পোশাক পরে তারা অতিথিদের অভ্যর্থনা জানায়। আসমাত জনগোষ্ঠীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কাঠের খোদাই। তাদের বিশ্বাস, প্রথম পূর্বপুরুষেরা কাঠের মূর্তি তৈরি করে তাতে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। তাই কাঠকে তারা পবিত্র উপাদান হিসেবে মানে।
ঐতিহ্যবাহী গোষ্ঠীগৃহে দর্শনার্থীরা দেখতে পান টিফা ঢোল, বুনো শুয়োরের দাঁতের মালা, পালকের শিরস্ত্রাণ ও তালপাতা দিয়ে বোনা ব্যাগ। এগুলো ইউনেস্কো কর্তৃক জরুরি সুরক্ষা প্রয়োজন এমন অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।
লরা ফ্রেঞ্চ বিওয়ার লাউত গ্রামে অংশ নেন ‘আত্মার মুখোশ অনুষ্ঠান’-এ। নির্বাচিত ব্যক্তিরা বেতের তৈরি পোশাক পরে পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতিনিধিত্ব করেন। ঢাকের বাদ্যি, গান ও নৃত্যে ভরে ওঠে পুরো গ্রাম।
আসমাতের পাশাপাশি পশ্চিম পাপুয়ায় রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। এখানেই অবস্থিত রাজা আম্পাত, যা কোরাল ট্রায়াঙ্গেলের কেন্দ্রস্থল। প্রায় ১,৫০০ দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল বিশ্বের পরিচিত প্রবাল প্রজাতির ৭৬ শতাংশ এবং ৩,০০০-এরও বেশি মাছের আবাসস্থল।
লরা ফ্রেঞ্চের যাত্রায় মোমনে অঞ্চলের ফিরোজা জলরাশি, প্রবাল প্রাচীর ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রাণী তাকে মুগ্ধ করেছে। কিটি-কিটি জলপ্রপাতের দৃশ্য ছিল ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ, যেখানে পাহাড় থেকে সাদা জলধারা সরাসরি নীল সমুদ্রে আছড়ে পড়ে।
আরো দক্ষিণে ট্রাইটন বে এখন ইন্দোনেশীয় স্কুবা ডাইভিং পর্যটনের নতুন আকর্ষণ। এখানে পর্যটক কম, প্রকৃতি অক্ষত। লরা ফ্রেঞ্চ ডুব দিয়ে দেখেছেন অ্যাঞ্জেলফিশ, পাফারফিশ, পিগমি সিহর্স, স্টিংরে ও সামুদ্রিক কচ্ছপ। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল বিশাল তিমি হাঙরের মুখোমুখি হওয়া। ট্রাইটন উপসাগরে সারা বছর প্রায় ৮০টিরও বেশি তিমি হাঙর থাকে।
পশ্চিম পাপুয়ার আসমাত অঞ্চল শুধু ভৌগোলিকভাবে দুর্গম নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। আদিবাসী আচার-অনুষ্ঠান, কাঠের খোদাই, ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহ্য এবং বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জগৎ; সব মিলিয়ে এটি এক অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। লরা ফ্রেঞ্চের মতে, এই যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল নির্জনতা ও প্রশান্তির অনুভূতি, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও সহজে পাওয়া যায় না।
logo-1-1740906910.png)