Logo
×

Follow Us

এশিয়া

আকাশপথে মানব পাচারের ৭ রুট চিহ্নিত

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১৮:৪৩

আকাশপথে মানব পাচারের ৭ রুট চিহ্নিত

বাংলাদেশ থেকে পর্যটন, শিক্ষা ও চাকরির ভিসার আড়ালে তরুণদের ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, বর্তমানে আকাশপথে মানব পাচারের জন্য সাতটি আন্তর্জাতিক রুট সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে নতুন গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে কম্বোডিয়া ও লাওস।

তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রথমে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়, এরপর কম্বোডিয়া বা লাওসে পাঠানো হয়। সেখানে তথাকথিত অনলাইন চাকরি বা কাস্টমার সার্ভিসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও অনেককে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রাখা হয়। জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা, জুয়া ও আর্থিক জালিয়াতির কাজে বাধ্য করা হয়। পালাতে চাইলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালি, সার্বিয়া/মেসিডোনিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং কম্বোডিয়া/লাওস মানব পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাচারকারীরা ভুক্তভোগীদের আকর্ষণীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাসপোর্ট ও ভিসা সংগ্রহ করে বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে বিদেশে পাঠায়। অনেক সময় তৃতীয় দেশে ট্রানজিট করিয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যে নেওয়া হয়, যাতে সরাসরি নজরদারি এড়ানো যায়।

যুক্তরাষ্ট্রগামীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে ব্রাজিল, পরে মেক্সিকো হয়ে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করা হয়। কানাডাগামীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও পর্যটন ভিসা ব্যবহার করে নেপালসহ তৃতীয় দেশে নিয়ে গিয়ে কানাডায় পাঠানো হয়। ইতালিগামী রুটটি সবচেয়ে জটিল, যেখানে বাংলাদেশ থেকে নেপাল, ভারত বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মধ্যপ্রাচ্য, এরপর মিসর, তিউনিসিয়া বা লিবিয়া হয়ে অবশেষে ইতালিতে পৌঁছানো হয়। এ যাত্রায় অনেককে মরুভূমি ও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়াগামী রুটে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, পরে ইন্দোনেশিয়া হয়ে সমুদ্রপথে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়। ছোট নৌকা বা মাছ ধরার ট্রলারে শত শত মানুষকে তোলা হয়, যেখানে খাবার ও নিরাপত্তার অভাবে বহু মানুষ নিখোঁজ বা নিহত হন। রাশিয়াগামী রুটে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব হয়ে রাশিয়ায় পাঠানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।

সিআইডি জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মানব পাচারের মামলা ও গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়েছে। এ সময়ে মোট ৩৪৪ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ১২২টি মামলা নথিভুক্ত হয়। তবে অধিকাংশ মামলার বিচার কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে। বিদ্যমান আইনে মানব পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান থাকলেও এখনো কোনো বড় রিক্রুটিং এজেন্সি বা ট্রাভেল এজেন্সির মালিকের বিরুদ্ধে সাজা হওয়ার নজির নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে না এলে মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, পাচারকারীরা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে পাঠায়। অনেক সময় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও বিচারহীনতার কারণে তারা পার পেয়ে যায়।

সিআইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানব পাচার এখন আন্তঃদেশীয় অপরাধে পরিণত হয়েছে। এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এটি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্ত ছাড়া বড় চক্র ভাঙা কঠিন। তাই সন্দেহজনক বিদেশযাত্রা বা অনলাইনে চাকরির প্রস্তাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন হতে হবে।

Logo