Logo
×

Follow Us

এশিয়া

মালয়েশিয়ার খবর ২৪ জানুয়ারি

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের নতুন চিত্র

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:৪৯

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের নতুন চিত্র

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ ঘিরে গড়ে ওঠা এক বিশাল দুর্নীতির সিন্ডিকেটের বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। প্রায় আট লাখের বেশি শ্রমিক, কয়েক বিলিয়ন ডলারের লেনদেন এবং দুই দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততায় এই নিয়োগ করিডরটি দীর্ঘদিন ধরে একটি নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের হাতে পরিচালিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ব্লুমবার্গ জানায়, এক শতাধিক শ্রমিক, নিয়োগ এজেন্ট, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই অনুসন্ধান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থাকে কার্যত একটি বন্ধ চক্রে পরিণত করা হয়েছিল, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও কোম্পানি ছাড়া অন্যদের প্রবেশাধিকার ছিল না। এর ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিককে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয় এবং বৈধ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মালয়েশিয়ার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সাবেক কর্মকর্তা দাতো আমিন এবং দেশটির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাহিদ হামিদির ভূমিকা এই সিন্ডিকেট গঠনে ও টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবেই নির্দিষ্ট কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশে কর্মী পাঠাতে আগ্রহী বহু বৈধ এজেন্সি কার্যত বাদ পড়ে যায়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এই ব্যবস্থার কারণে একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় যেতে সরকার নির্ধারিত খরচের কয়েক গুণ বেশি অর্থ দিতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থ আদায়ের পেছনে ছিল দালাল চক্র, ভুয়া কাগজপত্র এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। ফলে কর্মীরা বিদেশে পৌঁছানোর আগেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় পৌঁছে অনেকেই প্রতিশ্রুত কাজ বা বেতন পাননি। কেউ কেউ বৈধ কাগজপত্রের অভাবে অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন, আবার অনেকে দালালদের কাছে জিম্মি থেকেছেন। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে এমন একাধিক শ্রমিকের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যারা এই ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন।

তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দাতো আমিন। তিনি ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং তিনি কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। অন্যদিকে, প্রতিবেদনে উল্লিখিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অনুসন্ধান প্রতিবেদন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবাসী শ্রমিকদের দুরবস্থার একটি বড় উদাহরণ। বিশেষ করে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া করিডর দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, অতিরিক্ত খরচ ও দালাল নির্ভরতার জন্য আলোচিত। ব্লুমবার্গের এই প্রতিবেদন সেই অভিযোগগুলোকে প্রামাণ্য তথ্য ও সাক্ষ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুনভাবে সামনে এনেছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙতে দুই দেশের সরকারের মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর নজরদারি জরুরি। তা না হলে শ্রমিক শোষণ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপ ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ব্লুমবার্গ নিউজের এই অনুসন্ধান বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার ও কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং আট লাখের বেশি শ্রমিকের জীবনে এর কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসে কিনা।

Logo