Logo
×

Follow Us

প্রবাসের খবর

ব্রিটেনের সুইন্ডনে পাঁচ দিনব্যাপী জমজমাট দুর্গোৎসব

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:০৬

ব্রিটেনের সুইন্ডনে পাঁচ দিনব্যাপী জমজমাট দুর্গোৎসব

ব্রিটেনের সুইন্ডন শহরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, বাঙালি সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির আবহে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন করেছে সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটি। ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ভেন্যু থ্রিতে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে সুইন্ডন ছাড়াও উইল্টশায়ার, গ্লুচেস্টারশায়ার ও আশপাশের বিভিন্ন শহর থেকে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী অংশ নেন।

উৎসবে ব্রিটিশ সরকারের পরিবহনবিষয়ক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হেইডি আলেকজান্ডার, সুইন্ডনের মেয়র কাউন্সিলর নিল হপকিন্স, উইল্টশায়ারের লর্ড-লেফটেন্যান্ট ডেম সারা রোজ ট্রটন এবং সুইন্ডন বরো কাউন্সিলের লিডার কাউন্সিলর গ্যারি সামনারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পূজা-অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সংগীত, নৃত্য ও নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবটি প্রবাসে বাঙালি ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির দ্বিতীয় বর্ষের এ দুর্গোৎসব সফল করতে দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ দিনে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য ছয় হাজারের বেশি বিনামূল্যে প্রসাদ ও খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় আয়োজনটি আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

মহাসপ্তমী: মন্ত্রীর উপস্থিতি ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন

উৎসবের মহাসপ্তমীর দিন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিশুদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল বিশেষ আকর্ষণ। এদিন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন ব্রিটিশ সরকারের পরিবহনবিষয়ক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হেইডি আলেকজান্ডার। তিনি স্থানীয় বাঙালি ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেন।

দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এতে শত শত শিশু অংশ নেয়। তাদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ তুলে ধরা হয়। সন্ধ্যায় শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি নৃত্য ও সংগীতের পাশাপাশি আধুনিক পরিবেশনা এবং শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত অতিথি ও দর্শনার্থীদের বিনামূল্যে নৈশভোজ পরিবেশন করা হয়।

মহাষ্টমী: পুষ্পাঞ্জলি ও মেয়রের অংশগ্রহণ

দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাষ্টমী পালিত হয় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। সকাল থেকেই বিপুলসংখ্যক ভক্ত পূজামণ্ডপে সমবেত হন। দেবী দুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন, পূজা-অর্চনা, মন্ত্রোচ্চারণ ও ভক্তিমূলক সংগীতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ।

মহাষ্টমীর বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুইন্ডনের মেয়র কাউন্সিলর নিল হপকিন্স। তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে উৎসবে অংশ নেন। সন্ধ্যায় আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাঙালি সংগীত ও নৃত্যের পরিবেশনা ছিল উল্লেখযোগ্য। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী শিল্পীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ দিনটির আয়োজনকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়।

মহানবমী: শাস্ত্রীয় নৃত্য থেকে বলিউড পরিবেশনা

মহানবমীতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী শিল্পীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দর্শকদের আকৃষ্ট করে। এদিন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উইল্টশায়ারের লর্ড-লেফটেন্যান্ট ডেম সারা রোজ ট্রটন।

সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভরতনাট্যম, ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য, বলিউড নৃত্য, ঐতিহ্যবাহী বাঙালি নৃত্য ও সংগীত পরিবেশিত হয়। শিশু-কিশোরদের দলীয় পরিবেশনাও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। নতুন প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে প্রবাসে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যায়।

ঐতিহ্যবাহী শাড়ি, পাঞ্জাবি ও বাঙালি পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ ও শিশুদের উপস্থিতিতে উৎসবস্থল হয়ে ওঠে বর্ণিল। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রকাশ ঘটে।

বিজয়া দশমী: সিঁদুর খেলা ও উৎসবের সমাপ্তি

২০ অক্টোবর মঙ্গলবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হয়। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে পূজামণ্ডপে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। ভক্তরা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানান এবং আগামী বছর আবারো তার আগমনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

শেষ দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাঙালি নারীদের ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। এর পাশাপাশি সংগীত, নৃত্য, ধামাইল ও ডিজে পরিবেশনায় উৎসবস্থলে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিজয়া দশমীর বিশেষ অতিথি ছিলেন সুইন্ডন বরো কাউন্সিলের লিডার কাউন্সিলর গ্যারি সামনার। দিনজুড়ে অংশগ্রহণকারীরা একে অপরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান এবং আগামী বছর আবারো মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের মিলনমেলা

আয়োজকদের মতে, এবারের দুর্গোৎসবে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সুইন্ডন ও আশপাশের শহর থেকে আসা হাজারো মানুষের উপস্থিতি এ আয়োজনকে শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত করেছে।

দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকের সহযোগিতা এবং ছয় হাজারের বেশি বিনামূল্যের প্রসাদ ও খাবার পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আয়োজনটির সামাজিক দিকও ফুটে ওঠে। পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের সমন্বয়ে সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির দ্বিতীয় বর্ষের দুর্গোৎসব প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি সম্প্রীতির বন্ধন জোরদারের একটি উদ্যোগ হিসেবে উঠে এসেছে।

Logo