মালয়েশিয়ায় ইমিগ্রেশনের অভিযান: বাংলাদেশিদের সামনে এখন কী পথ?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫২
সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনে এই অভিযান ভীতিকর রূপ নিয়েছে। পালিয়ে থাকার আর কোনো সুযোগ থাকছে না। প্রতিদিনই ধরা হচ্ছে প্রবাসীদের। এমনকি শপিংমলেও অভিযান চালিয়ে ধরা হচ্ছে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া প্রবাসীদের।
প্রশ্ন উঠেছে, মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশিদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা কী? তাদের এখন কী করা উচিত?
তার আগে যে খবর সবচেয়ে ভীতিকর, সেটি বলে নিই
সাম্প্রতিক অভিযানে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কারখানা ও শিল্প এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো হচ্ছে। ৯ সেপ্টেম্বরের বড় অভিযানে ৪০টি কারখানা ও কয়েকটি শিল্প এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মীকে আটক করা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন অভিযানে বাংলাদেশিরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আটক হয়েছেন। অর্থাৎ, এটি আর বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার আইন প্রয়োগ এখন বেশ জোরালো।
বাংলাদেশিরা ঠিক কী অভিযোগে আটক হচ্ছেন?
মূল অভিযোগগুলো হলো— বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা না থাকা, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, বৈধ ওয়ার্ক পারমিট না থাকা, অনুমোদিত নিয়োগকর্তার বাইরে কাজ করা এবং ইমিগ্রেশন আইনের শর্ত ভঙ্গ করা। কিছু ক্ষেত্রে জাল বা ভুল কাগজপত্রের অভিযোগও সামনে আসছে। ফলে শুধু ‘ভিসা নেই’ এমন নয়, বৈধ কাগজ থাকলেও শর্ত ভাঙলে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন জোরালোভাবে আসছে, যেসব প্রবাসী ভিসার শর্ত ভঙ্গ করেছেন বলে অভিযোগ তারা কোন পরিস্থিতিতে এর শিকার হয়েছেন? মালয়েশিয়া প্রবাসী সাংবাদিকরা মাইগ্রেশন কনসার্নকে জানিয়েছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে প্রতারণা করেছে কিছু এজেন্সি ও দালাল। মালয়েশিয়ায় এনে তাদের ভিসার শর্তে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। শ্রমিকরা বাধ্য হয়েই কাজ করেছেন বিভিন্ন কোম্পানিতে। ফলে সেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে দেশের আইনে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
মালয়েশিয়ায় কত বাংলাদেশি অবৈধ অবস্থায় আছেন?
বর্তমানে ঠিক কত বাংলাদেশি অবৈধ অবস্থায় আছেন, তার নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ সরকারি সংখ্যা প্রকাশ্যে নেই। তবে ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন কারণে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশি বন্দি বা আটক রয়েছেন বলে জানা যায়। তার বাইরে ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ার কারাগার ব্যবস্থায় মোট বন্দির সংখ্যা ৮৪ হাজারের বেশি ছিল; যদিও সেখানে বাংলাদেশিদের আলাদা সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
আর ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারের বিষয়টিও আলাদা। ২০২৬ সালের মার্চে এসব কেন্দ্রে মোট ২১ হাজারের বেশি অভিবাসী ও শরণার্থী আটক ছিল; এটিকে সরাসরি কারাগারের বন্দি সংখ্যা বলা যায় না। আর সেখানেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যাও জানানো হচ্ছে না। তাই নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বলে আতঙ্ক তৈরি করা ঠিক হবে না। তবে বাংলাদেশ হাইকমিশন নিজেই অনিয়মিত বা কাগজপত্রহীন বাংলাদেশিদের বৈধভাবে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
মালয়েশিয়া কি এসব অবৈধ বাংলাদেশিকে গণহারে দেশে ফেরত পাঠাবে?
সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, বিশেষ করে যারা ধরা পড়বেন এবং বৈধ অবস্থান প্রমাণ করতে পারবেন না। তবে সবার ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা হবে এমন কথাও শক্ত করে বলা যায় না। মালয়েশিয়া বর্তমানে Migrant Repatriation Programme 2.0-এর মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় ও আইন মেনে দেশে ফেরার সুযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন অভিযানও চলছে।
অবৈধ অবস্থায় থাকা বাংলাদেশিদের এখন কী করা উচিত?
বাংলাদেশ হাইকমিশনের পরামর্শ খুব স্পষ্ট, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে বৈধ প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে। বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকলে সেটি প্রয়োজন হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে বা পাসপোর্ট না থাকলে হাইকমিশন থেকে ট্রাভেল পারমিট নিতে হবে। এরপর নির্ধারিত ইমিগ্রেশন অফিসে নিজে উপস্থিত হয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বাংলাদেশে ফেরার নিশ্চিত বিমান টিকিট দেখাতে হবে।
দালালের মাধ্যমে কি এই প্রক্রিয়া করা যাবে?
না। হাইকমিশন বিশেষভাবে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যাপারে সতর্ক করেছে। এই প্রক্রিয়ায় ‘বিশেষ সুবিধা’ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কাউকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবেদনকারীকে নিজেকেই নির্ধারিত ইমিগ্রেশন অফিসে যেতে হবে।
সবশেষ আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— অবৈধ অবস্থায় দেশে ফিরলে কি ভবিষ্যতে আর মালয়েশিয়ায় যাওয়া যাবে না?
এখানেই কিছুটা আশার কথা আছে। মনে শক্তি রাখুন। যদি কেউ আইন মেনে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরেন এবং তার বিরুদ্ধে এমন কোনো গুরুতর ইমিগ্রেশন অপরাধ না থাকে বা যদি ব্ল্যাকলিস্টে নাম না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে নিয়ম মেনে আবার মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যায় না। তবে নতুন ভিসা বা প্রবেশের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নিয়ম ও অনুমতির ওপর নির্ভর করবে।
তাই পালিয়ে থাকার চেয়ে আইন মেনে, নিরাপদে দেশে ফেরা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
logo-1-1740906910.png)