ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত আপাতত থেমেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যুদ্ধ থামা মানেই উত্তেজনা শেষ— এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। বরং এখন প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের পরবর্তী কৌশল কী? তারা কি নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে নজর দিচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দুটি দেশের নাম বারবার উঠে আসছে— তুরস্ক এবং পাকিস্তান।
তবে শুরুতেই একটা বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ইসরায়েল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বলেনি যে তুরস্ক বা পাকিস্তানই তাদের পরবর্তী সামরিক লক্ষ্য। কিন্তু বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইরান দুর্বল হলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুরস্ক এবং কিছু ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে দেখা হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাত ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কারণ, ইরান শুধু নিজে নয়, হামাস, হিজবুল্লাহ, হুথিসহ বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। যদি সেই চাপ কমে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির উত্থানকে ইসরায়েল খুব স্বাভাবিকভাবেই নজরে রাখবে।
সেখানে সবার আগে আসে তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক শুধু সামরিকভাবেই শক্তিশালী নয়, বরং সিরিয়া, লিবিয়া, ককেশাস এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের প্রভাবও বাড়িয়েছে। গাজা যুদ্ধের পর তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কও তলানিতে নেমে আসে। সিরিয়ায় ইসরায়েল ও তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রও অনেক জায়গায় একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। ফলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরো বাড়তে পারে। (Middle East Eye)
মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যদি "ইসরায়েলের প্রধান শত্রু" হিসেবে আগের অবস্থান হারায়, তাহলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে তুরস্ক। একই আলোচনায় পাকিস্তানের কথাও এসেছে। তবে এটি কোনো সরকারি অবস্থান নয়; বরং একজন বিশ্লেষকের মূল্যায়ন।
পাকিস্তানের নাম কেন আসছে?
এর উত্তর অনেকটাই রাজনৈতিক। পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফিলিস্তিন ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলবিরোধী।
তবে এটাও সত্য, পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সরাসরি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি। বরং আঞ্চলিক উত্তেজনায় তারা কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে পাকিস্তানকে ইসরায়েলের "পরবর্তী শত্রু" বলা এখনই বাস্তবতার চেয়ে বেশি একটি সম্ভাব্য কৌশলগত আলোচনা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিরিয়া। ইরান দুর্বল হলে সিরিয়ায় যে প্রভাবের শূন্যতা তৈরি হবে, সেখানে তুরস্কের ভূমিকা আরো বাড়তে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েলও সিরিয়ায় নিজেদের নিরাপত্তা বলয় বিস্তৃত রাখতে চাইছে। ফলে দুই দেশের স্বার্থের সংঘর্ষ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ইসরায়েল এখন একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্ট নিয়ে ব্যস্ত। গাজা, লেবানন, সিরিয়া; সবগুলো ক্ষেত্রেই তাদের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। তাই নতুন কোনো বড় সামরিক সংঘাত শুরু করা ইসরায়েলের জন্য সহজ সিদ্ধান্ত হবে না।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভবিষ্যতের সংঘাত শুধু ট্যাংক বা যুদ্ধবিমানের হবে না। গোয়েন্দা তৎপরতা, সাইবার যুদ্ধ, প্রক্সি বাহিনী এবং কূটনৈতিক চাপ; এসবই হবে নতুন প্রতিযোগিতার প্রধান অস্ত্র। সেই দিক থেকে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়লেও তা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
শেষ কথা
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আপাতত থেমেছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দাবার বোর্ডে খেলা শেষ হয়নি। ইসরায়েল এখন নিশ্চয়ই নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে কে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। তুরস্কের উত্থান, পাকিস্তানের অবস্থান এবং সিরিয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতা সেই আলোচনাকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, বিশ্লেষকদের আশঙ্কা আর সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি এক জিনিস নয়। তাই "ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য" নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ঘটনাপ্রবাহকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করাই হবে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ।
logo-1-1740906910.png)