Logo
×

Follow Us

এমসি এক্সপ্লেইনার

কম্বোডিয়ায় ডলার ইনকামের ফাঁদ, সাইবার স্ক্যামে নিঃস্ব বাংলাদেশিরা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৫:৩১

কম্বোডিয়ায় ডলার ইনকামের ফাঁদ, সাইবার স্ক্যামে নিঃস্ব বাংলাদেশিরা

বিদেশ গিয়ে ডলার কামানোর স্বপ্নে বাংলাদেশের বহু মানুষ প্রতারণার ফাঁদে পড়েন। সাইবার স্ক্যাম তেমনি নতুন এক প্রতারণার ফাঁদ। যে ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছে মানুষ। এই স্ক্যামের নতুন ঠিকানা এখন কম্বোডিয়া। 

বাংলাদেশি তরুণদের কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণার কাজে লাগানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চাকরি, কল সেন্টার, কাস্টমার সার্ভিস কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে সেখানে পাঠানো হলেও বাস্তবে পৌঁছানোর পর তারা পড়ে যান সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী ও সাইবার অপরাধচক্রের হাতে। অনেকে নির্যাতনের শিকার হন, মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন, আবার কেউ কেউ হয়ে যান নিখোঁজ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড’ এখন আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও অনলাইন প্রতারণার অন্যতম বড় কেন্দ্র। কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার বিদেশিকে আটকে রেখে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশর তরুণরা এই প্রতারণার শিকার দেশগুলোর একটি।

আসলে সাইবার স্ক্যাম কী?

সাইবার স্ক্যাম হলো ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার প্রতারণামূলক কার্যক্রম।

কম্বোডিয়ায় পরিচালিত এসব চক্র সাধারণত ভুয়া বিনিয়োগ, অনলাইন প্রেমের সম্পর্ক , ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লাভের প্রলোভন, অনলাইন ব্যবসা, ভুয়া চাকরির অফার বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতারণার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

এসব প্রতারণা ব্যবসা চালানোর জন্য বিদেশ থেকে নেওয়া কর্মীদের দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে ভুয়া পরিচয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য করা হয়।

কীভাবে বাংলাদেশিরা ফাঁদে পড়ছেন?

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার কৌশল সাধারণত কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়।

প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক গ্রুপ, ইউটিউব বিজ্ঞাপন, দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্টের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। মাসে এক থেকে তিন হাজার ডলার বেতন, থাকা-খাওয়ার সুবিধা এবং সহজ কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করা হয়।

অনেক ক্ষেত্রে পর্যটক ভিসা বা অন্য দেশের ট্রানজিট ব্যবহার করে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর জানানো হয়, চাকরি নয়, অনলাইনে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থ আদায়ের কাজ করতে হবে।

কাজে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, খাবার বন্ধ, বন্দি করে রাখা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা, মানসিক নির্যাতন কিংবা পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করার মতো অভিযোগও রয়েছে।

যারা পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কম্পিউটারের সামনে বসে বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণা করতে বাধ্য করা হতো।

ভুক্তভোগীদের অনেকেই বিদেশে যাওয়ার আগে জমি বিক্রি, ঋণ নেওয়া বা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে দালালদের কয়েক লাখ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত চাকরি না পেয়ে তারা হয়েছেন নির্যাতনের শিকার।

অনেকে দেশে ফিরলেও ঋণের বোঝা, মানসিক আঘাত এবং সামাজিক সংকট নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে হচ্ছে। কেউ কেউ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে পরিবারের অভিযোগ।

এখন পর্যন্ত কতজন শিকার হয়েছেন?

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কম্বোডিয়ায় সাইবার স্ক্যামে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।

তবে বিভিন্ন সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং আরো বহু বাংলাদেশি এখনো বিভিন্ন সময়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বা নিখোঁজ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে, কম্বোডিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক সাইবার স্ক্যাম চক্রের মাধ্যমে পাচারের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশিরাও সেই ভুক্তভোগীদের একটি অংশ।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন বাড়ছে এই প্রতারণা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বেকারত্ব, বিদেশে উচ্চ আয়ের আকাঙ্ক্ষা, অবৈধ রিক্রুটিং নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন এবং বিদেশে যাওয়ার আগে তথ্য যাচাই না করার কারণে এই প্রতারণা বাড়ছে।

এছাড়া অনেক চাকরিপ্রত্যাশী সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে দালালের ওপর নির্ভর করায় ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।

কীভাবে সতর্ক থাকবেন এই সাইবার স্ক্যাম থেকে?

সাইবার সংশ্লিষ্টরা এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞরব কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন—

বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির সরকারি অনুমোদন যাচাই করুন।

অস্বাভাবিক বেশি বেতন বা সহজ কাজের প্রলোভনে বিশ্বাস করবেন না।

পর্যটক ভিসায় চাকরির প্রস্তাব পেলে সতর্ক থাকুন।

চাকরির অফার লেটার, কোম্পানির নিবন্ধন ও নিয়োগপত্র যাচাই করুন।

পরিবারের সদস্যদের ভ্রমণের বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে রাখুন।

পাসপোর্ট, ভিসা ও প্রয়োজনীয় নথির কপি সংরক্ষণ করুন।

বিদেশে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিতে বাধ্য করা হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস বা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

দালালের পরিবর্তে সরকারি অনুমোদিত মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

সরকারের করণীয়

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কম্বোডিয়াগামী শ্রমিকদের ওপর আরো কঠোর নজরদারি, অবৈধ রিক্রুটিং চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান, ভুক্তভোগীদের দ্রুত উদ্ধার, দেশে ফিরে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং বিদেশে চাকরির বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি। ঢাকার বিমানবন্দর দিয়ে কম্বোডিয়া যেতে চাওয়াদের অবাধ যাওয়া বা জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সচেতন করা যেতে পারে।  

তাদের মতে, মানব পাচার ও সাইবার অপরাধ এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আরো কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো প্রতিটি চাকরির বিজ্ঞাপন বাস্তব নয়। সামান্য অসতর্কতা একজন তরুণের জীবন, পরিবারের সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ; সবকিছু কেড়ে নিতে পারে। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে প্রতিটি তথ্য যাচাই করা এবং বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই হতে পারে এই ভয়ংকর সাইবার স্ক্যাম থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়

Logo