রীতিমতো বোমা ফাটানোর হুমকি দিয়ে দিয়েছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির মুখপাত্র এব্রাহিম রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, দেশটি যদি আবারো আমেরিকা আর ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়, তাহলে ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার বিষয়টি সংসদে বিবেচনা করা হতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি পারমাণবিক তৎপরতা বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক অবস্থান এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে চলমান উদ্বেগের মধ্যেই এই মন্তব্যটি এসেছে, যা আঞ্চলিক সংঘাতের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- ইরান কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে?
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই যথেষ্ট। গবেষণা রিয়্যাক্টরের জন্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র-মানের উপাদান হিসেবে ধরা হয়, যা দিয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব।
ইরানের হাতে আছে ৪৪০ কেজি ইউেনিয়াম। যদিও তা এখন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ অবস্থানে আছে। এই ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে লাগে বহু সময়। সেই পথ পেরিয়ে এসেছে ইরান বহু আগেই। প্রশ্ন এখন অন্য জায়গায়, ইরানের বর্তমান সক্ষমতা আসলে কতখানি?
আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এটি ৯০ শতাংশে উন্নীত করা প্রযুক্তিগতভাবে তুলনামূলক ছোট একটি ধাপ। ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে লাগে মাত্র সাত দিন। ফলে এটি আন্দাজ করার যৌক্তিক কারণ আছে, পর্যাপ্ত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অস্ত্র-মানের উপাদান তৈরি করা সম্ভব। তবে কার্যকর পারমাণবিক বোমা বানাতে শুধু ইউরেনিয়াম নয়, বিস্ফোরণ নকশা, ডেলিভারি ব্যবস্থা এবং গোপন পরীক্ষাসহ আরো জটিল ধাপ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়।
তবে ভাবনা থেকে যায়, ইরান যদি সত্যি পরমাণু অস্ত্র বানানোর সক্ষমতা তৈরি করে ফেলে, তাহলে তার বিশ্ব প্রতিক্রিয়াই বা কেমন হবে?
বিশ্ব রাজনীতির বিজ্ঞজনেরা বলছেন, ইরান যদি আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো আমূল বদলে যেতে পারে। তাতে ইসরায়েল নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখলেও ইরানকে সরাসরি অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবেই দেখবে। সৌদি আরব দ্রুত নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার করতে পারে। তুর্কি ও মিসরও নতুন কৌশলগত হিসাব-নিকাশ শুরু করতে পারে। ফলে গোটা অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
বসে থাকবে না আমেরিকা আর ইউরোপও। তারা অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা জানাতে পারে। আর তাতে নড়েচড়ে বসবে জাতিসংঘ। বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বেড়ে যাবে অস্ত্র কেনার প্রতিযোগিতা।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর দেশটির রাজনীতিকদের বক্তব্যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মিলছে। এব্রাহিম রেজাইয়ের মন্তব্য সেই চাপ বাড়ারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে- এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। কিন্তু ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে, তা মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এক নতুন ও গভীর সংকটের সূচনা করতে পারে।
logo-1-1740906910.png)