ইরানে বড় কিছু ঘটাতে চাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:১২
সমঝোতার আলোচনার ময়দানেও আমেরিকার ঘাম ঝরিয়ে ছাড়ছে ইরান। তাই ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার একের পর এক হুমকি-ধমকি চলছেই। তারই অংশ হিসেবে আরব সাগরে আরো একটি মার্কিন রণতরী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কথা না শুনলে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু হবে বলে সরাসরি হুমকি এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে। এখন প্রশ্ন সমঝোতার আলোচনায় আমেরিকা কোন জায়গাটাতে বাগে আনতে পারছে না ইরানকে?
মূলত পাঁচটি প্রশ্নে আলোচনা হচ্ছে ইরান ও আমেরিকার।
এক. সবচেয়ে বড় ইস্যু হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম।যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা অস্ত্র বানাচ্ছে না, ফলে তারা এটা বন্ধও করবে না।
দুই. ইরানের প্রধান দাবি হচ্ছে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হোক, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন স্বাভাবিক করা। কিন্তু আমেরিকা পারমাণবিক ও আঞ্চলিক আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন ছাড়া পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে চাইছে না।
তিন. যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চাইছে ইরান তার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিগুলো সীমিত করুক। কিন্তু এই জায়গায় একেবারে অনড় ইরান।
চার. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযোগ, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তার করছে। এমন দাবির বিপরীতে ইরান বলছে, তারা "প্রতিরোধ জোট"কে সমর্থন করে। কারণ এটি তাদের বৈধ আঞ্চলিক কৌশল।
পাঁচ. মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি, উপসাগরে উত্তেজনা, ড্রোন হামলা; এসব নিয়েও পরোক্ষ আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা “ডিটারেন্স” বা প্রতিরোধমূলক চাপ বাড়াচ্ছে। ইরান বলছে, তারা যুদ্ধ চায় না, কিন্তু আমেরিকা যদি এসব হুমকির পথ না ছাড়ে, তাহলে তার জবাব দিতেও প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
ফলে এসব কারণে ইরানকে ঠিকমতো বাগে আনতে না পারলেও ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরান চুক্তির জন্য এক মাসের সময় পাবে। আলোচনায় অগ্রগতি দেখাতে হবে, তা না হলে যুক্তরাষ্ট্র “অনেক বড় বড় কিছু করে দেখাবে”। ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের মধ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি ও চাপ বাড়ানোর লক্ষ্য স্পষ্ট ইরানকে আলোচনায় বসাতে এবং একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা।আর সেই কারণেই আরো একটি বড় মার্কিন রণতরী যাচ্ছে পারস্য উপসাগরে। কিন্তু ইরানকে চাপে ফেলা কি সহজ কাজ?
ইরান মূলত তার দেশের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মানতেই চাইছে না। ইরান দাবি করছে, তাদের প্রতিরক্ষা নীতির ভূমিকাকে অন্যায়ভাবে বিপদের সঙ্গে যুক্ত করছে আমেরিকা। ইরান দাবি করছে, পশ্চিমাদের বিভিন্ন অভিযোগ রাজনৈতিভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর ফলে আলোচনায় মূল যে “ট্রাস্ট বিল্ডিং”, সেই বিষয়টিই এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। তাহলে এই সুযোগে ইসরায়েল কী করছে?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সার্বক্ষণ ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষপাতি। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে উস্কানি দিচ্ছেন। বর্তমানে ওয়াশিংটন সফরে থাকা নেতানিয়াহু এমনভাবে উস্কানি দিচ্ছেন, যাতে আমেরিকা এ দফায় শুরুতেই ইরানে হামলা চালায়। কারণ ইসরায়েল ইরানকে কেবল পারমাণবিক আলোচনা বা নিরাপত্তা ইস্যু নয়, একটি অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবেও দেখে। ইসরায়েল অনবরত চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে, আরো শক্ত করে তুলতে, যাতে কাটা দিয়ে কাটা তোলা যায়।
ফলে আরব সাগরে আরো যুদ্ধবিমান, রণতরী মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়ালেও ইরান তার নিজ দেশ রক্ষায় নিরাপত্তা দাবিকে ছাড়তে রাজি নয়; তাতে আলোচনার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের গণমাধ্যমের খবরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে ইরানকে আর “দেরি না করে সিদ্ধান্ত নিতে” চাপ দিচ্ছে, কিন্তু একটি সমঝোতা বা ইস্যুভিত্তিক চুক্তি তৈরি এখনো দৃশ্যমান নয়।
তাই বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা “এক প্রকার চাপাবাজির পর্যায়ে” আটকে আছে। ইরান তার নিরাপত্তা ও স্বার্থকে সামনে রেখে আরামদায়ক সমঝোতা করতে চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র কঠিন শর্ত চাপিয়ে দিয়ে বাগে আনতে চাইছে। ফলে এখন দুই দেশের মধ্যে একটা সমঝোতা হবে, নাকি একটা বড় যুদ্ধ বাধিয়ে বসবে যুক্তরাষ্ট্র, তা পরিষ্কার হতে হয়তো কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে।
logo-1-1740906910.png)