সৌদি-আমিরাত সম্পর্ক: বন্ধু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:২৭
মধ্যপ্রাচ্যের দুই শক্তিধর দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। একসময় যাদের সম্পর্ক ছিল নিখাদ বন্ধুত্বের। একই শিবির, একই স্বার্থ, একই কৌশল। কিন্তু এখন সেই সম্পর্কে স্পষ্ট টানাপোড়েন। বন্ধুত্বের উষ্ণতা যেমন চোখে পড়ে, তেমনি দূরত্বও লুকানো থাকে না। তাহলে কীভাবে দৃশ্যমান হলো সৌদি-আমিরাতের এই দূরত্ব? বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ফরেন অ্যাফেয়ার্স এ নিয়ে ছেপেছে এক বড় নিবন্ধ।
তাতে বলা হয়েছে, এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে হঠাৎ করে নয়, ধীরে ধীরে। সৌদির নেতৃত্বে আছেন মুহাম্মদ বিন সালমান বা এমবিএস আর অন্যদিকে আমিরাতের শাসক হলেন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বা এমবিজেড। ফলে বলা হচ্ছে, প্রতিযোগিতা চলছে এমবিএস আর এমবিজেডের মধ্যে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সৌদি ও আমিরাতের লক্ষ্য আর অগ্রাধিকার। সৌদি আরব চায় তার ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা বলয় ধরে রাখতে, আর আমিরাত চায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন নতুন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে। এখান থেকেই শুরু হয় দুই দেশের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে কোথায়?
সবচেয়ে বড় ফাটলটি দেখা যায় ইয়েমেনে। একসময় একই জোটে থাকা সৌদি ও আমিরাত এখন সেখানে ভিন্ন ভিন্ন শক্তিকে সমর্থন করছে। সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পাশে রাখছে, আর আমিরাত সমর্থন দিচ্ছে দক্ষিণ ইয়েমেনকে আলাদা রাষ্ট্র বানাতে চাওয়া ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’কে।গত ডিসেম্বরে ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে সৌদির বিমান হামলা, বন্দর ও সম্পদ ঘিরে দখলযুদ্ধ এই দ্বন্দ্বকে আরো প্রকাশ্যে এনেছে। কিন্তু ইয়েমেনই কি দুই দেশের একমাত্র প্রতিযোগিতার মঞ্চ?
না, প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে পড়েছে লোহিত সাগর, আফ্রিকার উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতেও। যেমন সোমালিয়ায় নতুন এক রাষ্ট্র সোমালিল্যান্ডকে সমর্থন দিচ্ছে আমিরাত, অন্যদিকে এনিয়ে সতর্ক অবস্থানে সৌদি আরব। তাছাড়া কোথায় কার প্রভাব থাকবে, কে নিয়ন্ত্রণ করবে বাণিজ্যপথ- এই প্রশ্ন ঘিরেই বাড়ছে কৌশলগত চাপ। তাহলে শক্তির বিচারে দুই দেশের অবস্থান ঠিক কেমন?
আয়তন ও জনসংখ্যায় সৌদি আরব নিঃসন্দেহে এগিয়ে। সৌদির আয়তন ২.১৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার, যা আমিরাতের চেয়ে প্রায় ২৭ গুণ বড়। জনসংখ্যাও বেশি ৩৫ মিলিয়ন, যার বড় অংশই সৌদি নাগরিক। অন্যদিকে, আমিরাতের জনসংখ্যা ১১ মিলিয়ন। তেলের মজুতেও সৌদি শীর্ষে, ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল আর আমিরাতের মজুত ১১৩ বিলিয়ন ব্যারেল। তাহলে তেলের মজুত, জনসংখ্যা, ল্যান্ডম্যাসে ছোট হয়েও আমিরাত কেন সৌদির সঙ্গে টক্কর দিতে পারছে?
এখানেই হলো আসল পার্থক্য। সৌদির শক্তি তার বিশালতা ও সম্পদে, আর আমিরাতের শক্তি দ্রুত সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক দক্ষতা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে। তেল কম হলেও আমিরাত নিজেকে বানিয়েছে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও লজিস্টিকসের হাব হিসেবে। এই স্বাধীন ও সাহসী পদক্ষেপগুলোই সৌদি আরবকে উদ্বিগ্ন করছে, বিশেষ করে যখন সেগুলো সৌদি নিরাপত্তা ভাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। তাহলে কি এই দ্বন্দ্ব যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে?
না, এটা সরাসরি যুদ্ধ বা সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার গল্প নয়। এটা মূলত নেতৃত্বের লড়াই। কে হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্র- রিয়াদ নাতি দুবাই? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রতিযোগিতাই দুই দেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই প্রতিযোগিতার প্রভাব পড়ছে আর কোথায় কোথায়?
এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। সৌদি আরবে বাড়ছে চাকরি, বিনোদন ও সামাজিক স্বাধীনতা। অন্যদিকে আমিরাত ভিসা সুবিধা, লাইফস্টাইল ও ব্যবসাবান্ধব নীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সৌদি আরব ও আমিরাত এখন আর শুধু বন্ধু নয়, তারা কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। আর এই প্রতিযোগিতাই ঠিক করে দেবে, আগামী দশকে মধ্যপ্রাচ্যের নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, সৌদি আরব নাকি সংযুক্ত আরব আমিরাত।
logo-1-1740906910.png)